জলবায়ু পরিবর্তন

প্রবল ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য


নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : জুন ২২, ২০২৬, ১০:৩৪ অপরাহ্ন
প্রবল ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন শুধু পরিবেশ ও প্রকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি ক্রমেই জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, ঘন ঘন বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো জলবায়ুজনিত ঘটনাগুলো মানুষের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও মানসিক সুস্থতার ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে নতুন নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. নাসরিন সুলতানা বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। তাপপ্রবাহ, বায়ুদূষণ, নিরাপদ পানির সংকট এবং রোগবাহিত জীবাণুর বিস্তার মানুষের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। তাই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে জলবায়ু অভিযোজনের সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে।”

রাজধানীর এক রিকশাচালক সাইফুল ইসলাম জানান, তীব্র গরমে দিনের বেলা কাজ করা এখন অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, “কাজ না করলে আয় নেই, কিন্তু রাস্তায় বের হলেই অসুস্থ বোধ হয়।”

এদিকে আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে মশাবাহিত রোগের বিস্তারও বাড়ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার ফলে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগের ঝুঁকি আগের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে।

সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রাশেদ মাহমুদ বলেন, “আগে নির্দিষ্ট মৌসুমে মশাবাহিত রোগের প্রকোপ দেখা গেলেও এখন বছরের দীর্ঘ সময়জুড়ে সংক্রমণের আশঙ্কা থাকছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মশার বিস্তারের ক্ষেত্র ও সময় দুটোই বেড়েছে।”

উপকূলীয় এলাকাগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত প্রভাব আরও স্পষ্ট। ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার পর বিশুদ্ধ পানির সংকট, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং দূষিত পানির ব্যবহারের কারণে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

সাতক্ষীরার বাসিন্দা রওশন আরা বলেন, “বন্যার পর নিরাপদ পানি পাওয়া সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। পরিবারের সবাইকে নিয়ে তখন উদ্বেগে থাকতে হয়।”

শুধু শারীরিক নয়, জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ঘন ঘন দুর্যোগ, সম্পদ ও জীবিকা হারানোর আশঙ্কা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেক মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ তৈরি করছে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সাবিহা করিম বলেন, “দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার হার বাড়ছে। কিন্তু এ বিষয়টি এখনো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না।”

অন্যদিকে কৃষি উৎপাদনে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব খাদ্য নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলছে। খরা, অতিবৃষ্টি ও মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি বাড়ছে, যা শিশু ও নারীদের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে।

পুষ্টিবিদ ডা. মাহমুদা আক্তার বলেন, “খাদ্যের দাম বাড়লে নিম্নআয়ের মানুষ প্রথমেই পুষ্টিকর খাবার কমিয়ে দেয়। ফলে অপুষ্টির ঝুঁকি দ্রুত বৃদ্ধি পায়।”

সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। খুলনার গৃহিণী নাজমা বেগম বলেন, “প্রায় প্রতিটি মৌসুমেই নতুন কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কখনো তীব্র গরম, কখনো আবার মশাবাহিত রোগে ভোগান্তি বাড়ছে।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অবকাঠামোকে জলবায়ু সহনশীল করে গড়ে তোলা জরুরি। তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কতা, রোগ নজরদারি জোরদার, বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে সবুজায়ন বৃদ্ধি, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নীতির বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।

বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত। এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে এর প্রভাব সমাজ, অর্থনীতি এবং জনজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আরও গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়বে। তাই জলবায়ু মোকাবিলার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারের পর্যায়ে নিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।