
একসময় যেখানে বাতাসে দুলত সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া আর গোলপাতার বন, সেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার মৃত গাছের কঙ্কাল। সাতক্ষীরা থেকে বাগেরহাট—দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে এক ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়। বাইরে থেকে এটি বনভূমি মনে হলেও ভেতরে নেই কোনো প্রাণের স্পন্দন। পরিবেশবিজ্ঞানীরা এই ভয়াল বাস্তবতার নাম দিয়েছেন ‘ঘোস্ট ফরেস্ট’ বা ‘প্রেতাত্মা বন’।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় এবং দীর্ঘস্থায়ী লোনা জলাবদ্ধতা মিলিয়ে উপকূলীয় বাস্তুসংস্থানের ওপর নেমে এসেছে এক নীরব মৃত্যুঘণ্টা। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গবেষকদের সাম্প্রতিক যৌথ গবেষণা বলছে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে সুন্দরবনের বৃহৎ অংশও একই পরিণতির দিকে এগোতে পারে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের যৌথ গবেষণায় উপকূলীয় বন ধ্বংসের পেছনের বৈজ্ঞানিক কারণ অনুসন্ধান করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক জার্নাল Estuarine, Coastal and Shelf Science-এ প্রকাশিত গবেষণাটিতে ২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্যাটেলাইট তথ্য, থার্মাল ম্যাপিং, রিমোট সেন্সিং ডাটা এবং মাঠপর্যায়ের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণার ফল বলছে, গত দুই দশকে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের মাটির লবণাক্ততা ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক এলাকায় মাটির ইলেকট্রিক্যাল কন্ডাক্টিভিটি (ইসি) স্বাভাবিক মাত্রার পাঁচ গুণ ছাড়িয়ে গেছে। এই পরিবর্তন উপকূলীয় উদ্ভিদ ও বনভূমির জন্য চরম হুমকি হয়ে উঠেছে।
‘ঘোস্ট ফরেস্ট’ এমন এক অবস্থা, যেখানে গাছ বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে থাকলেও ভেতরে মৃত। সমুদ্রের লোনা পানি দীর্ঘদিন ধরে মাটিতে জমে থেকে ভূগর্ভস্থ স্বাদু পানির স্তরকে দূষিত করে। ফলে গাছের শিকড় পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টি সংগ্রহ করতে পারে না।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত লবণাক্ততা গাছের জাইলেম টিস্যুতে লবণের স্ফটিক জমা করে। মানুষের শরীরে রক্তনালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতোই গাছের পানি পরিবহন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ ধীরে ধীরে পাতা ঝরে যায়, ক্লোরোফিল নষ্ট হয় এবং গাছ কঙ্কালসার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
গবেষণা দলের প্রধান অধ্যাপক ড. তানভীর আহমেদ বলেন, মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও ল্যাব পরীক্ষায় প্রমাণ মিলেছে যে উপকূলীয় গাছের মৃত্যুর মূল কারণ দীর্ঘস্থায়ী লবণাক্ততা। গাছগুলো বাইরে থেকে বেঁচে আছে মনে হলেও ভেতরে জৈবিক মৃত্যু ঘটে যাচ্ছে।
ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ডেভিড এস. মিলার জানান, স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে সুন্দরবনের সীমান্তবর্তী ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ বাফার জোনে ‘ঘোস্ট ফরেস্ট’ সিনড্রোমের লক্ষণ শনাক্ত হয়েছে। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান গতি অব্যাহত থাকলে এই সংকট দ্রুত বিস্তৃত হবে।
গবেষণা অনুযায়ী, সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ২২ শতাংশ সামাজিক বনায়ন এবং প্রাকৃতিক বনভূমি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বাগেরহাটের শরণখোলা অঞ্চলে এ হার প্রায় ১৪ শতাংশ।
বন ধ্বংসের প্রভাব কেবল গাছপালার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গাছ না থাকায় উপকূলে তাপমাত্রা বাড়ছে, সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী আর্দ্র তাপপ্রবাহ। একই সঙ্গে মাটির বন্ধন দুর্বল হয়ে নদীভাঙন ও বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। কৃষিজমিতে লবণের আস্তরণ পড়ে উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে এবং অনেক জমি স্থায়ীভাবে অনাবাদি হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘ঘোস্ট ফরেস্ট’ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং উদ্বেগজনক প্রভাবগুলোর একটি। উপকূলে মিষ্টি পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা না গেলে সুন্দরবনের বড় অংশ আগামী কয়েক দশকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
রিভার্সাইন আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আব্দুল কালাম মল্লিক বলেন, উপকূলে আর্দ্র তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব ও তীব্রতা দুই-ই বাড়ছে। লবণাক্ততা ও তাপপ্রবাহের যুগপৎ আঘাত মানুষ এবং প্রকৃতি উভয়ের জন্যই ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে।
গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন—
উপকূলের এই নীরব বিপর্যয় কেবল কয়েকটি জেলার সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের পরিবেশ নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের অস্তিত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, ‘প্রেতাত্মা বন’ প্রকৃতির একটি সতর্কবার্তা। সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হলে আগামী প্রজন্ম হয়তো সুন্দরবনের সবুজ মহিমা নয়, কেবল তার কঙ্কালসার স্মৃতিই দেখতে পাবে।
আপনার মতামত লিখুন :