জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব: ঝুঁকিতে বাংলাদেশসহ বিশ্ব


নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : মে ২৯, ২০২৬, ১:৩৭ অপরাহ্ন
জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব: ঝুঁকিতে বাংলাদেশসহ বিশ্ব

বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক সংকটগুলোর একটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে মানুষের অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার, বন উজাড় এবং শিল্পায়নের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যেই বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে।

জলবায়ু বলতে কোনো অঞ্চলের দীর্ঘ ৩০ থেকে ৩৫ বছরের গড় আবহাওয়াকে বোঝায়। কিন্তু বর্তমানে মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে সেই স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ফলে বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা, দেখা দিচ্ছে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

বিজ্ঞানীদের মতে, বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড ও মিথেন গ্যাস জমা হওয়ায় পৃথিবীর তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। সুইডিশ বিজ্ঞানী সভান্তে আরহেনিয়াস ১৮৯৬ সালেই এ বিষয়ে প্রথম ধারণা দেন। পরবর্তীতে বিশ্বের হাজারো বিজ্ঞানী একমত হন যে, মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডই বর্তমান জলবায়ু সংকটের মূল কারণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যানবাহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কলকারখানা ও রান্নাবান্নায় কয়লা, পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস বাড়ছে। একইসঙ্গে বন উজাড় পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

এর প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাড়ছে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, দাবানল, অতিবৃষ্টি ও তাপদাহের মতো দুর্যোগ। আন্তর্জাতিক সংস্থা World Meteorological Organization ও NASA জানিয়েছে, ২০২৪ সাল ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছরগুলোর একটি। প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা অতিক্রম করেছে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে রয়েছে এশিয়া। ২০২৩ সালে বন্যা, ঝড় ও তাপদাহে এ অঞ্চলে হাজারো মানুষের মৃত্যু এবং কোটি মানুষের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও চীনের মতো দেশগুলো চরম আবহাওয়ার প্রভাব মোকাবিলা করছে।

জলবায়ু ঝুঁকিতে বাংলাদেশের অবস্থানও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, উপকূলীয় লবণাক্ততা, অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চল সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকলে এ শতাব্দীর মধ্যেই বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এতে কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

এদিকে দেশে তাপদাহ, বজ্রপাত ও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বজ্রপাতের সংখ্যাও বাড়ছে। গত কয়েক বছরে বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু মানুষ নয়, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও মারাত্মক আঘাত হানছে। গলছে হিমবাহ, বিলীন হচ্ছে প্রবালপ্রাচীর, হুমকির মুখে পড়ছে বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো, বেশি বেশি গাছ লাগানো, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার এবং গণপরিবহন ও সাইকেল ব্যবহারে উৎসাহ বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে বৈশ্বিকভাবে কার্বন নিঃসরণ কমাতে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

তাদের মতে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তন মানবসভ্যতার জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।