
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক চূড়ান্ত জ্বালানি চাহিদার ৩৫ শতাংশ বিদ্যুতের মাধ্যমে পূরণের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে কপ-৩১ প্রেসিডেন্সি। জার্মানির বন শহরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে (বন ক্লাইমেট চেঞ্জ কনফারেন্স) এ ঘোষণা দেন কপ-৩১ প্রেসিডেন্ট-মনোনীত ও তুরস্কের পরিবেশ, নগরায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মুরাত কুরুম।
কপ-৩১ এর অ্যাকশন অ্যাজেন্ডার অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হিসেবে ঘোষিত এই লক্ষ্য অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বে চূড়ান্ত জ্বালানি ব্যবহারে বিদ্যুতের অংশীদারিত্ব ২০ শতাংশের কিছু বেশি থেকে বাড়িয়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে একটি বৈশ্বিক জোট গঠনেরও ঘোষণা দিয়েছে প্রেসিডেন্সি।
মুরাত কুরুম বলেন, “অ্যাকশন অ্যাজেন্ডাই বাস্তবায়নের চালিকাশক্তি। পরিবহন, ভবন ও শিল্পখাতসহ দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে আমরা পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অস্থির জ্বালানি বাজারের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে পারি। ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩৫ শতাংশ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্য কপ-৩১ প্রেসিডেন্সির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হবে।”
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) ও আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা (IRENA)-এর বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নির্ধারিত এই লক্ষ্য প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করবে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিদ্যুতায়ন লক্ষ্যমাত্রার পাশাপাশি কপ-৩১ প্রেসিডেন্সি ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক বর্জ্য বৃদ্ধির হার অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যও ঘোষণা করেছে। ‘শূন্য বর্জ্য’ (জিরো ওয়েস্ট) অর্জনের লক্ষ্যে নেওয়া এ উদ্যোগে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে খাদ্য অপচয় কমানোর ওপর। কারণ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ১০ শতাংশের জন্য খাদ্য অপচয় দায়ী, যার বড় অংশই মিথেন গ্যাস থেকে আসে। মিথেনের উষ্ণায়ন ক্ষমতা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় প্রায় ৮০ গুণ বেশি।
এ ছাড়া ভবন খাতে জ্বালানি ব্যবহারের ঘনত্ব ২০৩৫ সালের মধ্যে অন্তত ২৫ শতাংশ কমিয়ে আনার নতুন বৈশ্বিক লক্ষ্যও ঘোষণা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ব্যয়ের চাপ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার আশা করা হচ্ছে।
কপ-৩১ প্রেসিডেন্সি খাদ্য নিরাপত্তা, উৎপাদন খাতে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের ব্যবহার এবং জলবায়ু শিক্ষা বিষয়ক নতুন উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে। পাশাপাশি ‘ক্লাইমেট ইমপ্লিমেন্টেশন ব্রিজ’ নামে একটি নতুন কাঠামোর বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে, যা জাতীয় জলবায়ু, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন অগ্রাধিকারের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জলবায়ু অর্থায়নের প্রবাহ ত্বরান্বিত করবে।
বিদ্যুতায়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতায় IEA-কে দুটি বিশেষ প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে ‘৩৫ বাই ৩৫’ লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাব্য পথনকশা এবং বর্জ্য হ্রাস ও সার্কুলার অর্থনীতি জোরদারের সুফল বিশ্লেষণ করা হবে।
অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রী এবং কপ-৩১ এর নেগোসিয়েশন প্রেসিডেন্ট ক্রিস বোয়েন বলেন, “জ্বালানি ব্যবস্থার রূপান্তর দ্রুততর হলে জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে, ব্যয় কমবে এবং বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে।”
জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন কনভেনশনের (UNFCCC) নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিল বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনে বিদ্যুতায়ন অন্যতম কার্যকর উপায়।
আগামী নভেম্বরে তুরস্কের আন্টালিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য কপ-৩১ সম্মেলনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ৮ থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত জার্মানির বন শহরে জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কপ-৩১ প্রেসিডেন্সির মতে, নতুন বিদ্যুতায়ন লক্ষ্যটি কপ-২৮ এ নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা তিনগুণ বাড়ানোর অঙ্গীকার এবং কপ-২৯ এ জ্বালানি সংরক্ষণ, বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিকায়ন ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়ন সংগ্রহের উদ্যোগের ধারাবাহিকতা হিসেবে কাজ করবে।
আপনার মতামত লিখুন :