
উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে মে মাস যেন এক অজানা আতঙ্কের নাম। এর মধ্যে শেষ ১০ দিনে বেশি আতংকে উপকূলের মানুষ। বৈশাখের খরতাপ শেষ হতে না হতেই বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হতে থাকে নিম্নচাপ গভীর নিম্নচাপ কিংবা ঘূর্ণিঝড়।
আবহাওয়ার প্রতিটি সতর্ক সংকেত তখন উপকূলবাসীর মনে নতুন করে ভয় জাগায়। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, কক্সবাজারসহ উপকূলীয় জেলাগুলোর লাখো মানুষ মে মাস এলেই আতঙ্কে দিন গোনেন। অতীতের ভয়াবহ স্মৃতিগুলো এখনও তাদের তাড়া করে ফেরে।
২০০৭ সালের সিডর, ২০০৯ সালের আইলা, ২০২০ সালের আম্পান, ২০২১ সালের ইয়াস কিংবা ফনি পরবর্তী ঘূর্ণিঝড়গুলোর ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। অনেক পরিবার এখনও ঘর হারানোর কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছে। কারও জমি লবণাক্ত পানিতে নষ্ট হয়েছে কেউ হারিয়েছেন জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুমে বাড়ে উদ্বেগ আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এপ্রিল থেকে মে এবং অক্টোবর থেকে নভেম্বর বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়।
তবে মে মাসে সাগরের তাপমাত্রা বেশি থাকায় শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা বাড়ে। ফলে উপকূলের মানুষের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো ধরনের বিপদ সংকেতের কথা জানা যায়নি। শ্যামনগরের গাবুরার বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, মে মাস এলেই আমরা আতঙ্কে থাকি।
রাতে বাতাস একটু জোরে বইলেই মনে হয় আবার বুঝি আইলার মতো কিছু হবে। একই ধরনের শঙ্কা প্রকাশ করেন বুড়িগোয়ালিনী এক গৃহবধূ রেহেনা বেগম বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের খবর শুনলেই আগে চাল-ডাল শুকনো খাবার জমাই। কারণ কখন পানি উঠে ঘর ভাসিয়ে দেয় বলা যায় না। দুর্বল বেড়িবাঁধ বাড়াচ্ছে ঝুঁকি উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার একটি হচ্ছে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ।
বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ এখনও টেকসইভাবে সংস্কার হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বিশেষ করে সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় সামান্য জোয়ার কিংবা নিম্নচাপের প্রভাবেই বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশের ঘটনা ঘটে। এতে কৃষিজমি, মাছের ঘের এবং বসতবাড়ি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বরাদ্দ এলেও অনেক ক্ষেত্রে কাজের মান নিম্নমানের হওয়ায় টেকসই সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না। ফলে ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম এলেই বেড়িবাঁধ নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক শুরু হয়।
লবণাক্ততা কেড়ে নিচ্ছে জীবিকা : উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের আরেকটি বড় প্রভাব হচ্ছে লবণাক্ততা বৃদ্ধি। জলোচ্ছ্বাসের পানি নদী ও খাল হয়ে কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ে। এতে বছরের পর বছর জমিতে চাষাবাদ ব্যাহত হয়। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কৃষিকাজ ছেড়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। কেউ মাছ ধরছেন, কেউ দিনমজুরি করছেন, আবার কেউ পরিবার নিয়ে শহরমুখী হচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা ও জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতাও আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
আশ্রয়কেন্দ্র সংকট ও দুর্ভোগ : সরকারিভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে বহু ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও এখনও অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র নেই। কোথাও আশ্রয়কেন্দ্র দূরে কোথাও যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল। ফলে দুর্যোগের সময় নারী শিশু ও বৃদ্ধদের নিরাপদ স্থানে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় মানুষ গবাদিপশু নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারেন না। ফলে ঘরবাড়ি রক্ষার আশায় ঝুঁকি নিয়েই বাড়িতে অবস্থান করেন।
জেলেদের দুশ্চিন্তা বাড়ে : মে মাস এলেই সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের মধ্যে বাড়ে উদ্বেগ। আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তন দমকা হাওয়া ও উত্তাল সাগরের কারণে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরতে যেতে হয় তাদের। অনেক সময় গভীর সাগরে থাকা ট্রলারগুলো সময়মতো সতর্কবার্তা না পাওয়ায় দুর্ঘটনার শিকার হয়। এতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব : বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের একটি। ঘূর্ণিঝড়ের ঘনত্ব ও শক্তি বৃদ্ধি অস্বাভাবিক জলোচ্ছ্বাস নদীভাঙন এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বড় প্রভাব রয়েছে। শুধু ত্রাণ বা সাময়িক ব্যবস্থা নয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে উপকূলকে রক্ষা করতে হবে। টেকসই বেড়িবাঁধ, আধুনিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারি প্রস্তুতি ও বাস্তবতা : প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় মৌসুমে সরকার বিভিন্ন প্রস্তুতির কথা জানালেও বাস্তব চিত্র অনেক সময় ভিন্ন দেখা যায়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং স্থানীয় প্রশাসন প্রস্তুত থাকলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বরত এসডিও ইমরান হোসেন বলেন, শ্যামনগরে সর্বমোট ৪.৫ কিলোমিটারের মত বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ আছে। আমরা যুক্তিপূর্ণ পয়েন্ট গুলো চিহ্নিত করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। যদি হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে আমাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণের জিআইইউ ব্যাগ সহ সকল সরঞ্জামাদি মওজুত আছে।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জামান কনক বলেন, আমি নতুন এসেছি তবে শুনেছি মে মাসের শেষ দিকে ঝড়,জলোচ্ছ্বাস, নদীর পানি বৃদ্ধিতে শ্যামনগরের মানুষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করে রেখেছি।
আপনার মতামত লিখুন :