
উপকূলীয় বাংলাদেশে পানির ও মাটির লবণাক্ততা এখন জনজীবন, কৃষি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় সুপেয় পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের মানুষ প্রতিদিন লবণাক্ত পানির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন। এর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে নারী ও শিশুদের ওপর।
বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে উপকূলীয় এলাকায় বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে স্থানীয় সতর্ক সংকেত নম্বর ৩ দেখাতে বলেছে। দমকা হাওয়া ও ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কার পাশাপাশি উপকূলীয় নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। নদীভাঙন এবং ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো এখনো পুরোপুরি মেরামত না হওয়ায় উপকূলবাসীর উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়া এবং জোয়ারের পানির চাপ বৃদ্ধির কারণে খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলে লবণাক্ততা দ্রুত বাড়ছে। এতে কৃষিজমির উর্বরতা কমছে, ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং নিরাপদ পানির উৎস সংকুচিত হয়ে পড়ছে। উপকূলের প্রায় ৭৩ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। দেড় কোটির বেশি মানুষ বাধ্য হয়ে লবণাক্ত ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করছেন।
বাগেরহাটের মোংলা উপজেলায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্যমতে, উপজেলার প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষের নিরাপদ পানি সংগ্রহের স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে পলিমার ট্যাংকি বিতরণ করা হলেও তা দিয়ে মাত্র ৪ থেকে ৬ মাসের পানির চাহিদা পূরণ সম্ভব হয়। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে জনসংখ্যার তুলনায় পানি সংরক্ষণের পুকুর ও ট্যাংকির সংখ্যা খুবই অপ্রতুল।
উপকূলীয় নারীদের জীবন সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শ্যামনগর, মোংলা ও কয়রার মতো এলাকায় নারীরা প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে মিঠা পানি সংগ্রহ করেন। দীর্ঘ সময় ভারী পানির পাত্র বহনের কারণে জরায়ু নেমে যাওয়া, কোমর ও মেরুদণ্ডের সমস্যা বাড়ছে। এছাড়া লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে থাকার কারণে চর্মরোগ, অনিয়মিত ঋতুস্রাব, জরায়ুর প্রদাহ ও জরায়ু ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ২৫ বছর বয়সী আসমা আখতার জানান, নদীতে দীর্ঘ সময় মাছ ধরার কাজ করতে গিয়ে তিনি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন। ছয় মাস আগে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার জরায়ু অপসারণ করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “এই নোনা পানি আমাদের শৈশব, স্কুল আর স্বপ্ন সব শেষ করে দিয়েছে।” একইভাবে কালীবাড়ি গ্রামের লিপি খানম জানান, লবণাক্ত পানির কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রজনন স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলে কৃষিতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। ধান চাষ কমে গিয়ে অনেকেই চিংড়ি ঘেরের দিকে ঝুঁকছেন। তবে এতে ছোট কৃষক ও নারীরা আর্থিকভাবে তেমন লাভবান হচ্ছেন না। বরং পরিবেশগত ক্ষতি বাড়ছে। খাদ্য সংকট ও পুষ্টিহীনতার কারণে নারী ও শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে। অনেক পরিবারে নারীরা নিজেদের খাবার কমিয়ে সন্তানদের খাওয়াচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে উপকূলীয় এলাকায় পানির সংকট আরও তীব্র হবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় বাংলাদেশকে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের অন্যতম দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, ২১০০ সালের মধ্যে দেশের উপকূলীয় এলাকার প্রায় ১৮ শতাংশ তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে সংকটের মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছেন উপকূলের নারীরাই। অনেক নারী এখন বিকল্প জীবিকার দিকে ঝুঁকছেন। কাঁকড়া চাষ, তিল চাষ, নার্সারি, হাইড্রোপনিক ও অ্যাকুয়াপনিক্স চাষের মাধ্যমে তারা স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নারীভিত্তিক জীবিকা গ্রুপ গঠন, প্রশিক্ষণ ও বাজার সংযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারও সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। বড় পুকুর, খাল ও জলাশয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, গভীর নলকূপ স্থাপন এবং খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, টেকসই অবকাঠামো এবং জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রম জোরদার করা গেলে উপকূলের মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।
আপনার মতামত লিখুন :