
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের (এফওয়াই২৭) বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের তিনটি প্রধান সংস্থা—স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিডি), কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়—মোট জলবায়ু ব্যয়ের ৫৩ শতাংশেরও বেশি বরাদ্দ পেয়েছে।
বাজেট নথি অনুযায়ী, জলবায়ু-সম্পর্কিত কার্যক্রমের জন্য মোট ৫১ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ, যার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। বিভাগের মোট বাজেটের প্রায় ২৮ শতাংশ জলবায়ু কর্মসূচিতে ব্যয় হবে। এই অর্থ জলবায়ু সহনশীল গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র উন্নয়ন, খাল খনন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণে ব্যয় করা হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১০ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা, যা মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটের ৩৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট লবণাক্ততা, খরা ও বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, জলবায়ু-স্মার্ট সেচব্যবস্থা এবং মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন কর্মসূচিতে এই অর্থ ব্যয় করা হবে। মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু ব্যয়ের ৯৫ শতাংশেরও বেশি খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য জলবায়ু-সম্পর্কিত বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। এটি মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটের ৫৫ দশমিক ৩১ শতাংশ, যা সব মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ অনুপাত। নদীভাঙন রোধ, বন্যা ব্যবস্থাপনা, ভূমি পুনরুদ্ধার এবং লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পগুলো এ বরাদ্দের আওতায় বাস্তবায়িত হবে।
মন্ত্রণালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নৌপথের নাব্যতা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পানি-সম্পর্কিত জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা জোরদার করা হবে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। এ প্রেক্ষাপটে জলবায়ু অর্থায়ন শুধু সহায়তার উৎস নয়, বরং এটি সহনশীলতা, উদ্ভাবন এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি।
তিনি আরও বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের অন্যতম কৌশলগত অগ্রাধিকার হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে মানুষ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানি সম্পদকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ, টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।
আপনার মতামত লিখুন :