জলবায়ুর ত্রিমুখী হুমকিতে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক শিশু: ইউনিসেফ


নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : জুন ১৮, ২০২৬, ১:৪৬ অপরাহ্ন
জলবায়ুর ত্রিমুখী হুমকিতে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক শিশু: ইউনিসেফ

বিশ্বের প্রায় ১১০ কোটি শিশু বর্তমানে অন্তত তিনটি জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মুখোমুখি, যা তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে হুমকির মুখে ফেলছে বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ। সংস্থাটির প্রকাশিত চিলড্রেনস ক্লাইমেট রিস্ক রিপোর্ট ২০২৬-এ এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা, দাবানল ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো একাধিক জলবায়ু দুর্যোগের সম্মিলিত প্রভাবে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক শিশুর দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পাশাপাশি তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, “তাপপ্রবাহ, দাবানল, খরা ও বন্যার প্রভাবে শিশুদের জীবন ক্রমাগতভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের অর্ধেক শিশু অন্তত তিনটি জলবায়ুজনিত হুমকির মধ্যে বসবাস করছে, যা তাদের প্রতিদিনের জীবনকে প্রভাবিত করছে।”

প্রথমবারের মতো এই প্রতিবেদনে বিশ্বের কোন অঞ্চলে এবং কী মাত্রায় একাধিক জলবায়ু ঝুঁকি শিশুদের ওপর প্রভাব ফেলছে, তার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারগুলো কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, সে বিষয়েও সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় প্রতিটি শিশুই অন্তত একটি জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মুখোমুখি। এর মধ্যে ৪০ লাখেরও বেশি শিশু একসঙ্গে ছয়টি পর্যন্ত জলবায়ু হুমকির মধ্যে বসবাস করছে। ইউনিসেফ উপকূলীয় বন্যা, নদীভাঙন ও বন্যা, খরা, চরম তাপমাত্রা, তাপপ্রবাহ, দাবানল, বালু ও ধূলিঝড় এবং ঘূর্ণিঝড়সহ আটটি প্রধান জলবায়ু ঝুঁকির তথ্য বিশ্লেষণ করেছে।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রায় ২৯ কোটি ৬০ লাখ শিশু এমন এলাকায় বসবাস করছে, যেখানে খরা, চরম তাপমাত্রা এবং তাপপ্রবাহ একসঙ্গে আঘাত হানে। এছাড়া ১১ কোটি ৫০ লাখের বেশি শিশু খরা, চরম তাপমাত্রা ও ঘূর্ণিঝড়ের সম্মিলিত ঝুঁকিতে রয়েছে।

জলবায়ুজনিত এসব ঝুঁকির পাশাপাশি প্রতিবেদনে বায়ুদূষণ ও ম্যালেরিয়ার বিষয়টিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি শিশুকে প্রভাবিত করছে। অন্যদিকে প্রায় ১০০ কোটি শিশু ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও তীব্র হতে পারে।

প্রতিবেদনটি সতর্ক করে বলেছে, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত কমানো না গেলে জলবায়ুজনিত দুর্যোগ আরও ঘনঘন ও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এর ফলে সরকারি সেবা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে এবং শিশুদের জীবন ও কল্যাণ আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।

আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে ৪০ লাখের বেশি শিশু তাপপ্রবাহ, চরম তাপমাত্রা এবং বালু ও ধূলিঝড়ের ত্রিমুখী হুমকির মুখে রয়েছে।

তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও পাকিস্তানসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শিশুরা বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় বেশি সংখ্যক এবং অধিক তীব্র জলবায়ু ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।

উন্নত দেশগুলোও এ সংকট থেকে মুক্ত নয়। ইতালিতে ৬০ লাখের বেশি শিশু দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ও খরার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে দেশটি জলবায়ু অভিযোজন ও সহনশীল অবকাঠামোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়, তার একটি উদাহরণও তৈরি করেছে।

শিশুদের সুরক্ষায় ইউনিসেফ সরকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন অংশীদারদের প্রতি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো ও সামাজিক সেবায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

একই সঙ্গে জলবায়ু শিক্ষা, জ্ঞান ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে শিশু ও তরুণদের জলবায়ু কার্যক্রমে অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছে সংস্থাটি।

ক্যাথরিন রাসেল বলেন, “এই বিশ্লেষণ সরকার ও নীতিনির্ধারকদের আরও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সহনশীল সেবাখাতে বিনিয়োগে সহায়তা করবে। শিশুদের প্রয়োজনকে সামনে রেখে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামো ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে আমরা তাদের বর্তমান জলবায়ু ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারব এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সক্ষম হব।”

প্রতিবেদনটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে যে, জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিকারদের মধ্যে শিশুরা অন্যতম। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে এখনই সমন্বিত ও কার্যকর বৈশ্বিক পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।