
বাংলাদেশের আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে উচ্চমাত্রার মিথেন গ্যাসের এক অদৃশ্য স্তর, যা স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, দেশটি এখন বিশ্বের অন্যতম ‘মিথেন নিঃসরণ হটস্পট’-এ পরিণত হয়েছে। এতে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বায়ুমণ্ডলে মিথেনের ঘনত্ব ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে এই হার ১ হাজার ৯৪১ পার্টস পার বিলিয়ন (পিপিবি) ছাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় মিথেন প্রায় ৮০ গুণ বেশি তাপ ধরে রাখতে সক্ষম, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের মিথেন নিঃসরণের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ত্রুটিপূর্ণ গ্যাসলাইন এবং সনাতন কৃষি পদ্ধতি। রাজধানীর মাতুয়াইল ও আমিনবাজার এবং চট্টগ্রামের বড় ল্যান্ডফিলগুলো থেকে পচন প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ মিথেন গ্যাস নির্গত হচ্ছে। একই সঙ্গে পুরোনো গ্যাস পাইপলাইনের লিকেজ থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস বাতাসে মিশে যাচ্ছে।
এ ছাড়া দীর্ঘসময় ধানখেতে পানি জমিয়ে রাখার ফলে উৎপন্ন অ্যানেরোবিক ব্যাকটেরিয়া থেকেও মিথেন তৈরি হচ্ছে। গবাদিপশুর বর্জ্য এবং নদীভাঙনের ফলে পানির নিচে চাপা পড়া জৈব পদার্থের পচন প্রক্রিয়াও এই নিঃসরণ বাড়াচ্ছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, মিথেন সরাসরি বিষাক্ত না হলেও এটি বায়ুমণ্ডলের নিচের স্তরে গ্রাউন্ড লেভেল ওজোন তৈরি করে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এর ফলে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিসসহ দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে ফুসফুসের স্থায়ী ক্ষতি ও অকালমৃত্যুর আশঙ্কাও বাড়ছে।
অন্যদিকে, মিথেনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহরে ‘হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব তৈরি হচ্ছে। কিছু এলাকায় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি রেকর্ড করা হয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
কৃষি খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গবেষণা অনুযায়ী, মিথেন-সৃষ্ট ওজোনের কারণে ধান ও গমের ফলন ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
এদিকে গ্যাস পাইপলাইনের লিকেজের কারণে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি অপচয় হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অপচয় হওয়া গ্যাস দিয়ে দেশের কয়েক মাসের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ সম্ভব।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ‘কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম’ বা মিথেন-ভিত্তিক কর আরোপের উদ্যোগ নিচ্ছে। এতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিলে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। ল্যান্ডফিল থেকে মিথেন সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন, স্যানিটারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গ্যাসলাইনের লিকেজ শনাক্তে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং ধান চাষে উন্নত পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে নিঃসরণ কমানো যেতে পারে।
তাদের মতে, মিথেন নিঃসরণ এখন শুধু পরিবেশগত নয়, বরং অর্থনৈতিক ও জনস্বাস্থ্যের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এর প্রভাব ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :