সুন্দরবন উপকূলে জলবায়ু বিপর্যয় বাড়ছে দুর্যোগ, ত্বরান্বিত হচ্ছে বাস্তুচ্যুতি


নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারী ১৫, ২০২৬, ৬:৫৪ অপরাহ্ন
সুন্দরবন উপকূলে জলবায়ু বিপর্যয় বাড়ছে দুর্যোগ, ত্বরান্বিত হচ্ছে বাস্তুচ্যুতি

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন-সংলগ্ন উপকূলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন তীব্র হচ্ছে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলকে ঘিরে থাকা বিস্তীর্ণ জনপদে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা ও নদীভাঙনের মাত্রা ও ঘনত্ব বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এর ফলে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও মৎস্য খাত মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে; বাড়ছে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত তিন দশকে দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ১০–১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় ও অস্বাভাবিক বন্যায় বসতভিটা হারিয়ে উপকূলের মানুষ বাধ্য হচ্ছেন অন্যত্র আশ্রয় নিতে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। লবণাক্ততার আগ্রাসন, নদী-খাল দখল ও দূষণে কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক জীবিকা সংকুচিত হচ্ছে; জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়ছে এর নেতিবাচক প্রভাব।

আন্তর্জাতিক সংস্থা International Displacement Monitoring Centre-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে নতুন করে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। উন্নয়ন সংস্থা কারিতাস বাংলাদেশ আশঙ্কা করছে, একই সময়ের মধ্যে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ২ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছাতে পারে। তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ, ঢাকার বস্তিবাসীদের প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে নিজ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জলবায়ুজনিত কারণে স্থানচ্যুতদের প্রায় ৬০ শতাংশ রাজধানী ঢাকায়, ২০ শতাংশ চট্টগ্রামে এবং বাকি ২০ শতাংশ অন্যান্য জেলায় আশ্রয় নিয়েছে।

‘ক্লাইমেট ভালনারেবিলিটি অ্যান্ড রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট ইন লো-লাইং কোস্টাল সিটিজ অব বাংলাদেশ ইউজিং অ্যানালিটিক হায়ারার্কিক প্রসেস’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেশের ২২টি শহরের ঝুঁকিচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর জার্নাল অব ওয়াটার অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ-এ প্রকাশিত গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-এর গবেষকরা। তাদের মতে, জলবায়ু ঝুঁকির প্রকৃত প্রভাব মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কতটা গভীর—তা কেবল পরিসংখ্যানে পুরোপুরি ধরা পড়ে না।

Climate Central-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন–আগস্ট সময়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশ অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের মুখে পড়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ, বাংলাদেশের প্রায় ৩৪ শতাংশ মানুষ ৩০ দিনের বেশি সময় স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ তাপমাত্রায় বসবাস করেছে।

বাংলাদেশের ৭১১ কিলোমিটার উপকূলীয় তটরেখা—যার মধ্যে সুন্দরবন উপকূল ১২৫ কিলোমিটার এবং কক্সবাজার উপকূল ১৫৫ কিলোমিটার—প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার অববাহিকার পানি সমুদ্রে পতিত হওয়ার পথে ব-দ্বীপ ও জোয়ারভাটা সমভূমির ভূখণ্ডে পরিবর্তন আনে। বছরে গড়ে প্রায় ১৫ লাখ হেক্টর জমি বন্যা ও জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে। শুষ্ক মৌসুমে উজানে পানিপ্রবাহ কমে গেলে লোনাপানি প্রবেশ করে চাষাবাদে নতুন সংকট তৈরি করছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান জানান, বর্ষায় অতিবৃষ্টি ও শুষ্ক মৌসুমে দীর্ঘ খরা—দুই চরম অবস্থাই কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও জলোচ্ছ্বাস কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করছে; কৃষকদের ফসলের ধরন বদলাতে হচ্ছে।
একই বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দা ইসরাত নাজিয়া বলেন, আগে বড় দুর্যোগ ১০–১৫ বছর পরপর ঘটলেও এখন প্রায় প্রতিবছরই আঘাত হানছে। ফলে উপকূলের বিশাল জনগোষ্ঠী জীবিকা ও বসতির নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

পরিবেশবিদদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাধার ভরাট, বন উজাড় ও অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। একটি আদর্শ শহরে অন্তত ২৫ শতাংশ সবুজ এলাকা থাকার কথা থাকলেও দেশের কোনো শহরেই সেই মানদণ্ড পূরণ হচ্ছে না।
কার্যকর অভিযোজন ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা দ্রুত গ্রহণ না করলে সুন্দরবন-উপকূলের মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হবে—এমন সতর্কবার্তাই দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।