বৈশ্বিক উষ্ণতার সঙ্গে ‘সুপার এল নিনো’: দ্বিমুখী জলবায়ু সংকটের মুখে বিশ্ব


নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : জুন ২১, ২০২৬, ৬:৫০ অপরাহ্ন
বৈশ্বিক উষ্ণতার সঙ্গে ‘সুপার এল নিনো’: দ্বিমুখী জলবায়ু সংকটের মুখে বিশ্ব

বৈশ্বিক উষ্ণতার মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করা এল নিনো। বিশ্বের বিভিন্ন আবহাওয়া সংস্থা ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে ‘সুপার এল নিনো’ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা, আকস্মিক বন্যা, খাদ্য উৎপাদনে ব্যাঘাত এবং পানির সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনো যুক্ত হলে আবহাওয়ার চরম ঘটনাগুলো আরও ঘন ঘন ও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। অনেক গবেষক আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছর ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ সময়গুলোর মধ্যে স্থান পেতে পারে।
জলবায়ুবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত চক্র, যা সাধারণত দুই থেকে সাত বছর অন্তর দেখা দেয়। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বাণিজ্যিক বায়ু উষ্ণ পানি পশ্চিম দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। তবে বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়লে উষ্ণ পানি মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে জমা হতে থাকে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ওপর পড়ে।
আবহাওয়া পর্যবেক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরের বিভিন্ন অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পূর্বাভাস মডেল ইঙ্গিত দিচ্ছে, চলতি বছরের শেষভাগে এল নিনো অত্যন্ত শক্তিশালী রূপ নিতে পারে। বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করছেন, এটি গত কয়েক দশকের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনোর প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন হলেও সামগ্রিকভাবে এটি বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। আফ্রিকা, এশিয়া, মধ্য আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় বৃষ্টিপাত কমে গিয়ে খরা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। অন্যদিকে কিছু অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, বন্যা, ভূমিধস এবং ফসলহানির ঝুঁকি বাড়তে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে দাবানলের ঘটনাও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। কৃষি খাত সরাসরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় খরা, অতিবৃষ্টি কিংবা অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বিশ্বের বিভিন্ন কৃষিপ্রধান অঞ্চলে ধান, গম, ভুট্টাসহ নানা খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ ও বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আগাম প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে কৃষি সহায়তা, খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি, পানি সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খরা ও বন্যা সহনশীল বীজ সরবরাহ, আগাম সতর্কবার্তা এবং কৃষকদের সহায়তার বিষয়েও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশেও এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সতর্ক রয়েছেন আবহাওয়াবিদ ও গবেষকেরা। তাদের মতে, দেশের কিছু অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে এবং তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। ফলে তাপপ্রবাহের মাত্রা ও স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে মৌসুমি বায়ুর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হলে কৃষি উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনো দেখা দিলেই বাংলাদেশে ভয়াবহ খরা হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং তাপপ্রবাহ, স্বল্প বৃষ্টিপাত, আকস্মিক অতিবৃষ্টি, নদীর পানিপ্রবাহের পরিবর্তন এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো ঝুঁকিগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, এল নিনোর একটি বড় সুবিধা হলো এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে এবং কয়েক মাস আগেই এর পূর্বাভাস পাওয়া যায়। ফলে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আগাম পরিকল্পনা গ্রহণের সুযোগ পায়। পানি সংরক্ষণ, কৃষি পরিকল্পনা, খাদ্য মজুত এবং দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।