
বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধি রোধে মিথেন নির্গমন হ্রাসে কিছু অগ্রগতি হলেও আরও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে— এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP)। নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে শনাক্ত করা ৩ হাজার ৫০০টির বেশি মিথেন নিঃসরণ ঘটনার মধ্যে গত এক বছরে সরকার ও শিল্প খাতের প্রতিক্রিয়া ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মিথেন নির্গমন পর্যবেক্ষণ সংস্থা (IMEO)-এর পঞ্চম সংস্করণের প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ অংশ বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে ট্র্যাক করা হচ্ছে। যদিও এটি ইতিবাচক অগ্রগতি, তবুও ২০৩০ সালের মধ্যে মিথেন নির্গমন ৩০ শতাংশ কমানোর বৈশ্বিক অঙ্গীকার পূরণে এখনো গতি বাড়ানো প্রয়োজন।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসন বলেন, “মিথেন নির্গমন কমানো গেলে খুব দ্রুত বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কিন্তু প্রতিবেদন প্রকাশে অর্জিত অগ্রগতি এখনই বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নিতে হবে। প্রতিটি কোম্পানিকে Oil and Gas Methane Partnership 2.0–এ যুক্ত হতে হবে এবং সরকারসহ সবাইকে স্যাটেলাইট সতর্কবার্তার জবাব দিতে হবে।”
শিল্পখাতে স্বচ্ছতা বাড়ছে, তবে কাজ বাকি
ওজিএমপি ২.০ (OGMP 2.0) বর্তমানে বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস খাতে মিথেন নির্গমন পরিমাপ ও নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃত মানদণ্ড হিসেবে গড়ে উঠেছে। গত পাঁচ বছরে সদস্য কোম্পানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৩, যা এখন বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৪২ শতাংশ কভার করছে।
এর মধ্যে ৬৫টি কোম্পানি—বিশ্ব উৎপাদনের ১৭ শতাংশ—‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ অর্জন করেছে, অর্থাৎ তারা বাস্তব পরিমাপের ভিত্তিতে নির্গমন রিপোর্ট করছে। আরও ৫০টি কোম্পানি ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড পথ’-এ রয়েছে।
স্যাটেলাইট সতর্কবার্তায় সাড়া বাড়লেও গতি পর্যাপ্ত নয়
IMEO-এর মিথেন অ্যালার্ট অ্যান্ড রেসপন্স সিস্টেম (MARS) স্যাটেলাইট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় বিশ্বের ৩৩টি দেশে ৩,৫০০টিরও বেশি বড় নির্গমন ঘটনা শনাক্ত করেছে। গত বছর মাত্র ১ শতাংশ সতর্কবার্তায় প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলেও, এবার তা বেড়ে ১২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই প্রতিক্রিয়ার ফলে এখন পর্যন্ত ১০টি দেশে ২৫টি নির্গমন হ্রাস উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে।
তবে এখনো প্রায় ৯০ শতাংশ সতর্কবার্তায় কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। UNEP বলছে, দ্রুত পদক্ষেপ ছাড়া গ্লোবাল ওয়ার্মিং রোধের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়।
ইস্পাত ও বর্জ্য খাতে নজর দিচ্ছে UNEP
মিথেন নির্গমন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটিয়ে এখন ইস্পাত উৎপাদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে নজর দিচ্ছে UNEP। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইস্পাত উৎপাদনে ব্যবহৃত ধাতব কয়লার কারণে এই খাতের কার্বন পদচিহ্নের এক-চতুর্থাংশ তৈরি হয়, অথচ মাত্র ১ শতাংশ ব্যয়ে এই নির্গমন কমানো সম্ভব।
IMEO ইস্পাত খাতে স্বচ্ছতা আনার জন্য একটি “Steel Methane Transparency Database” তৈরি করছে, যা খনি পর্যায়ের নির্গমন তথ্য, স্যাটেলাইট ডেটা এবং শিল্পখাতের গবেষণা একত্র করবে।
এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে ছয় মহাদেশে ৪৬টি বৈজ্ঞানিক গবেষণা সম্পন্ন করেছে, যার মাধ্যমে তেল ও গ্যাস স্থাপনায় নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষাসহ ধানক্ষেত ও প্রাণিসম্পদ খাত থেকে নির্গমনের পরিমাণ নির্ধারণে সহায়ক তথ্য পাওয়া গেছে।
অতিরিক্ত মন্তব্য
ইউরোপীয় কমিশনের জ্বালানি ও আবাসন বিষয়ক কমিশনার ড্যান জর্গেনসেন বলেন, “মিথেন হলো সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রীনহাউস গ্যাসগুলোর একটি। UNEP-এর সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে এখন ইউরোপসহ বৈশ্বিক বাজারে নির্গমন নিয়ন্ত্রণে দায়বদ্ধতা বাড়ছে।”
জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপমন্ত্রী তাকেহিকো মাতসুও বলেন, “মিথেন নির্গমন কমানো একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। সঠিক ও কার্যকর তথ্যই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। জাপানের নতুন স্যাটেলাইট মিশন UNEP-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে তথ্য-নির্ভর পদক্ষেপ নিশ্চিত করবে।”
আপনার মতামত লিখুন :